হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি- বনলতা সেন

0

নাটোরের বনলতা সেন | কে এই বনলতা সেন?

*বনলতা সেন: নাটোরের কথা উঠলে সবার আগে ‍উঠে আসে বনলতা সেনের নাম। এমন কোন ব্যক্তি পাওয়া যাবে না যিনি এই বনলতা সেনের নাম শোনেন নি। কিন্তু কে সেই বনলতা সেন?  কি তাঁর আসল পরিচয়?*

*যে প্রশ্নটি আসে সেটি হলো, কে সেই বনলতা সেন? বনলতা সেন নামের কোনো মেয়ের সঙ্গে কি জীবনানন্দ দাশের আদৌ পরিচয় ছিল? “গোপালচন্দ্র রায় একবার কবিকে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন, দাদা আপনি যে লিখেছেন নাটোরের বনলতা সেন, আসলে  এই বনলতা সেনটা কে?” এই নামে সত্যি আপনার পরিচিত কেউ ছিল নাকি?  উত্তরে কবি শুধুমাত্র একগাল মুচকি হাসি দিয়েছিলেন। কবি কখনো নিজের অজান্তেও এই বিষয়ে কারো কাছে কিছু বলেননি। কবি নীরব থাকলেও যুগ যুগ ধরে গবেষকরা এই বনলতা সেনকে খুঁজে ফিরছেন। বাস্তবে এমন কোনো বনলতা সেনের অস্তিত্ব তারা খুজে বের করতে পারেননি।*

*জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন পুরো কবিতায় মাত্র তিনবার ‘বনলতা সেন’ নামটি এসেছে। অথচ পুরো কবিতার বাকি অন্য কোনো কিছু নিয়ে মানুষের কোনো মাথা ব্যথা নেই। সবাই পড়ে আছেন শুধুমাত্র এই ’বনলতা সেনকে’ নিয়ে। থাকাটাই স্বাভাবিক কেননা এখানে যে নারী=নারী গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।*

*এই কবিতায় জীবনা’নন্দ দাশ ’বনলতা সেনের’ বাড়ি উল্লেখ করেছেন নাটোর জেলাকে। এরপর থেকে বাংলা সাহিত্যে নাটোর জেলা বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। এই নাটোর জেলা নিয়েও রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। যেমন: – কবি কি কখনো নাটোরে পদার্পণ করেছিলেন? জীবনানন্দ দাশের লেখা অন্য কোনো লেখায় নাটোরের উল্লেখ পাওয়া যায় নি। তাই এই বিষয়টিও অনেকের কাছে প্রশ্ন রয়ে গেছে।*

*কবি জীবনা’নন্দ দাশ বাস্তবের কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নাকি কল্পনার কাউকে উদ্দেশ্য করে কবিতাটি লিখেছেন তা এখনো কোনো গবেষক এর কূলকিনারা খুজে বের করতে পারেন নাই। তবে নাটোরের মানুষের কাছে ’বনলতা সেন’ একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। নাটোরে স্থানীয়ভাবে ‘বনলতা সেন’ কে নিয়ে বেশকিছু কাহিনী গড়ে উঠেছে কিন্তু বাস্তবিক এর কোনো ভিত্তি নেই। কেননা ইতিহাসে এসব কাহিনীর কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই।*

*একসময় ট্রেনে করে দার্জিলিং যেতে হলে নাটোরের উপর দিয়েই যেতে হতো। নাটোরে প্রচলিত একটি কাহিনীতে দেখা গেছে,  একদিন জীবনানন্দ দাশ ট্রেনে করে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন। ট্রেনটি যখন নাটোর স্টেশনে থামে তখন ”অপরূপ” সুন্দরী একটি মেয়ে ট্রেনে ওঠে। মেয়েটির সাথে ভুবন-সেন নামের একজন বৃদ্ধাও ছিলেন। কবি যে কামরায় ছিলেন সেই কামরাতেই তারা উঠেন এবং কামরায় শুধুমাত্র এই তিনজনই ছিলেন। ভুবন-সেন ছিলেন নাটোরের বনেদি সুকুল পরিবারের তারাপদ সুকুলের ম্যানেজার। অপরূপ সুন্দরী সেই মেয়েটি ছিল ভুবন সেনের বিধবা বোন ‘বনলতা সেন’। একসময় ভুবন সেন ঘুমিয়ে পড়েন। এসময় বনলতা সেনের সাথে কবির আলাপচারিতা জমে ওঠে। এভাবে অনেকটা সময় তারা খোশ গল্প করে কাটিয়েছেন। এক সময় ‘বনলতা সেন’ ট্রেন থেকে নেমে যায়। কবি আবার একা হয়ে যান। ‘বনলতা সেন’ কবিতার একটি লাইন এখানে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। তা হলো – ”থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন”।*

*অপর যে কাহিনীটি উল্লেখ আছে সেটিতেও ভুবন-সেনের কথা বলা হয়েছে। এখানে ‘বনলতা সেন’ ভুবন-সেনের বিধবা বোন ও ঘটনাস্থল ট্রেনের পরিবর্তে ভুবন সেনের বাড়ির কথা বলা হয়েছে এবং নাটোরের বনেদি পরিবার সুকুল বাবুর কথাও বলা হয়েছে। কবি একদিন নাটোর বেড়াতে যানএবং তিনি সুকুল বাবুর বাড়িতে ওঠেন। একদিন দুপুরে ভুবন সেন কবিকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। কবিকে আপ্যা’য়ন করার দায়িত্ব দেয়া হয় ভুবন সেনের বিধবা বোন ‘বনলতা সেনকে। ভুবন সেনের বিধবা বোন বনলতা সেনের ওপর পড়েছে অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব। খাবারের বিছানায় বসে আছেন কবি। হঠাৎ অব-গুন্ঠিত এক বিধবা নারী। শ্বেত-শুভ্র বসনের চেয়েও অপরূপ এক সৌন্দর্য-মন্ডিত মুখ। চমকে উঠলেন কবি! এত অল্প বয়সে বিধবা-বসন কবির মনকে আলোড়িত করে। হয়তো সে সময় দুই একটি কথাও হয় কবির সঙ্গে বনলতার। তারপর একসময় নাটোর ছেড়ে যান কবি কিন্তু যাওয়ার সময় সঙ্গে নিয়ে যান এক ”অপরূপ” মুখের ছবি। সেই ছবিই হয়তো কবিকে পথ দেখিয়েছে অন্ধকারে, চারদিকে সমুদ্র সফেনের ভেতরও খুঁজে পেয়েছেন চরম শান্তির পরশ।*

*সর্বশেষ  আরেকটি কাহিনী নাটোরে প্রচলিত আছে। তবে এবার ঘটনা’স্থল নাটোরের রাজবাড়ি। কোনো এক সময় নাটোরের কোনো এক রাজার ”আমন্ত্রণে” রাজবাড়িতে বেড়াতে আসেন কবি জীবনা’নন্দ দাশ। কবির দেখাশোনা করার জন্য রাজা কয়েকজন সুন্দরীকে দায়িত্ব দেন এদের মধ্যে একজন সুন্দরীর প্রতি কবির আলাদা মমতা জেগে ওঠে। কবি সেই সুন্দরীকে নিয়ে কবিতা লেখার প্রস্তাব দেন কিন্তু সেই সুন্দরী তাতে মত দেয় না। অবশেষে কবির পীড়া-পীড়িতে কবিকে অন্য কোনো নামে কবিতা লেখার অনুরোধ করেন। তথন সেই সুন্দরীর প্রকৃত নাম লুকিয়ে বনলতা-সেন নামটিই উল্লেখ করেছিলেন।*

*গল্প কাহিনী জল্পনা কলাপনা যত যাই থাক কোনোটিরই বাস্তবিক কোনো ভিত্তি ও ইতিহাস সূত্র বহন করে না। বড় বড় সব গবেষকরাও বছরের পর বছর গবেষণা করে এই বনলতা সেনের রহস্য উদঘাটন করতে পারেন নি। বিশ্বের বড় বড়  ’রহস্যের’ মতো এটিও একটি অজানা-রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে।*

নাটোরর বনলতা সেনকে  নিয়ে জীবনানন্দ দাশের  একটি কাবিতা আছে-

বনলতা সেন

– জীবনানন্দ দাশ

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন ।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর

হাল ভেঙ্গে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে – সব নদী – ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

Share:
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *